ঢাকা সোমবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ই আশ্বিন ১৪২৮

কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর প্রক্রিয়া


প্রকাশিত:
২১ আগস্ট ২০২১ ২৩:৫৯

আপডেট:
২২ আগস্ট ২০২১ ০০:৩১

গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যায় ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার অধিকাংশ এলাকা এখন থৈ থৈ। বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ জন। পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল হিসেবে ভারী বৃষ্টিপাত রোধের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ, সহায়তা নেয়া হচ্ছে ‘ক্লাউড সিডিং’ পদ্ধতির। এ পদ্ধতিতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়। অর্থাৎ মেঘ জাকার্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বৃষ্টি ঝরানো হবে। ফলে জাকার্তায় আর ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা থাকবে না।

কৃত্রিম বৃষ্টিপাত হলো প্রকৃতির ওপর বৈজ্ঞানিক প্রভাব খাটিয়ে সংঘটিত জোর করে বৃষ্টি নামানো! এ জন্যে প্রথমে মেঘ সৃষ্টি করতে হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই মেঘকে ঘনীভূত করে বৃষ্টিপাতের উপযোগী অবস্থায় নিয়ে আসতে হয় এবং সবশেষে বৃষ্টি ঝরানো হয়। তবে সচরাচর আকাশে ভাসমান মেঘকে পানির ফোঁটায় পরিণত করেই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়।

ক্লাউড সিডিংয়ে সাধারণ রাসায়নিক যেমন সিলভার আয়োডাইড, পটাশিয়াম আয়োডাইড অথবা শুষ্ক বরফ বা কঠিন কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। তরল প্রোপেন গ্যাসও ব্যবহার করা হয়। এ গ্যাস সিলভার আয়োডাইডের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় বরফের স্ফটিক তৈরি করতে পারে। তবে অনেক সস্তা ও বেশ কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এ কাজে এখন সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাবার লবণের ব্যবহার বাড়ছে। ক্লাউড সিডিংয়ের সময় মেঘের ভেতরের তাপমাত্রা -২০ থেকে -৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসেন তখন তুষারপাত বেড়ে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে সিলভার আয়োডাইডের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।

ক্লাউড সিডিংয়ের উপাদানগুলো উপযুক্ত স্থানে উড়োজাহাজে করে অথবা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। মেঘের ভেতর দিয়ে যখন উড়োজাহাজটি যায় তখন সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ রাসায়নিকের ক্ষুদ্র স্ফটিকদানাগুলোই মেঘের সিড হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এসব দানায় ভাসমান জলীয়বাষ্পে পানি কণাগুলো জড়ো হয়ে বড় ফোঁটায় পরিণত হয়। একসময় ওজন বেড়ে গিয়ে মহাকর্ষের টানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।

 


কৃত্রিম বৃষ্টির ইতিহাস


১৮৯১ সালে লুই গাথমান প্রথম কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টিতে তরল কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। ১৯৩০ এর দশকে বার্গারন-ফাইন্ডিসেন বরফের স্ফটিক কণার উপস্থিতিতে অতীব ঠাণ্ডা পানির কণা জমে এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে নামে- এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তত্ত্ব তৈরি করেন। এ তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেন জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষক ভিনসেন্ট শিফার। ১৯৪৬ সালের জুলাইতে তিনি কৃত্রিম বৃষ্টির মূলনীতি আবিষ্কার করেন। পরে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী আরভিং ল্যাংমুর সঙ্গে যৌথভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টির কৌশল নিয়ে গবেষণা করেন।

‘ক্লাউড সিডিং’ এর ব্যবহার

কোনো একটি এলাকায় কৃত্রিম বৃষ্টির মাধ্যমে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১০%-২০% বাড়ানো সম্ভব। খরাপ্রবণ এলাকায় ফসল ফলাতে এ কৌশল বেশ কার্যকর। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভারী বৃষ্টিপাত ও হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। ঘূর্ণিঝড় এলাকায় প্রচুর মেঘ থাকে, থাকে নিম্নচাপও। যখন সে ঘূর্ণিঝড় প্রবল শক্তি নিয়ে লোকালয়ে আঘাত করে তখন ক্ষয়ক্ষতির শেষ থাকে না। এমন অবস্থায় সেখানকার ঘূর্ণিঝড়ের মাঝে ক্লাউড সিডিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বৃষ্টি ঝরিয়ে ঘূর্ণিঝড়কে দুর্বল করে ফেলা যায়। সম্প্রতি এই কাজটিই করছে ইন্দোনেশিয়া।

২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক গেমসের ঠিক আগে ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টি ঝরিয়েছিল চীন, যাতে পুরো আয়োজন বৃষ্টির কারণে বিঘ্নিত না হয়। চীনই সবচেয়ে বেশি কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি ঝরায়। এমনকি অতিমাত্রায় এ কৌশল ব্যবহারের কারণে চীনের বিরুদ্ধে বৃষ্টি চুরির অভিযোগ করে প্রতিবেশীরা। ভারতেও কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে।

চীন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইসরায়েল, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বুলগেরিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, রাশিয়া, জার্মানি, স্লোভেনিয়া, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার মালি, নাইজার, মরক্কো, বুরকিনা ফাসো এবং সেনেগাল বেশ কয়েকটি ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।


বিষয়:



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top