ঢাকা মঙ্গলবার, ২১শে মে ২০২৪, ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১


মানবশরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক, কী বলছে বিজ্ঞানীরা?


প্রকাশিত:
১৬ এপ্রিল ২০২৪ ২০:১৬

আপডেট:
১৬ এপ্রিল ২০২৪ ২০:২৭

মাইক্রো প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ভেসে বেড়ায়- ২০১৫ সালে এ তথ্য সামনে আসার পরই বিজ্ঞানীরা এসব মাইক্রোপ্লাস্টিকে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে তারা গবেষণা শুরু করেন। 

তাদের অনেক পরিশ্রমের পর এ তথ্য উঠে এলো যে, সাগর, সামুদ্রিক মাছ, এমনকি ঝিনুকের মধ্যেও উপস্থিত রয়েছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। যা মানুষ অজান্তেই গ্রহণ করছে নানাভাবে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সেগুলো ঢুকছে মানব শরীরে।

নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ও গবেষক ডিক ভেথাক জেনেছিলেন, সমুদ্রের মাছ ও ঝিনুকের মত সামুদ্রিক খাবারেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া যেতে পারে। গবেষকরা তখন প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে মাইক্রোপ্লাস্টিক ভেসে বেড়াতে দেখেন।

তখন মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক খোঁজা শুরু করেন ভেথাক ও তার দল। বিভিন্ন অঙ্গ, রক্ত আর টিস্যুতে তারা প্লাস্টিক কণা খোঁজা শুরু করেন।

ইকোটক্সিকোলজিস্ট ভেথাক বলছেন, সেই অনুসন্ধানে যে ফলাফল তারা পেয়েছেন তা গুরুতর।

বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, মাইক্রোপ্লাস্টিক বা তার চেয়ে আরো ক্ষুদ্র কণা ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে গর্ভফুল, রক্ত, লিভার, হৃদযন্ত্র ও অন্ত্রে।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৬২টি গর্ভফুলের প্রতিটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অন্য আরেকটি গবেষণার প্রতিটি নমুনার ধমনীতে এই প্লাস্টিক কণা মিলেছে।

মানব শরীরে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির প্রমাণ মিললেও সেগুলো শরীরের কতটুকু ক্ষতি করছে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই বিজ্ঞানীদের। এগুলো ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেইসঙ্গে আলঝেইমার্সের সমস্যা ও প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রতি বছর কোটি কোটি টন প্লাস্টিক মিশছে পরিবেশে। ফলে বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় ডুবছে গোটা বিশ্ব। এমন অবস্থায় মানুষ কতটা আক্রান্ত হচ্ছে, কোন কোন সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং সমস্যার আকার কেমন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই গবেষকদের। প্লাস্টিক দূষণের স্রোতের সঙ্গে তারাও পাল্লা দিয়ে ছুটছেন। কিন্তু কতটা অগ্রগতি হচ্ছে?

রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফার্মাকোলজি অ্যান্ড টক্সিকোলজির’ অধ্যাপক ফোবি স্ট্যাপলটন বলেন, “এভাবে বলতে আমার ভালো লাগছে না। কিন্তু আমরা এখনো গোড়াইতেই পড়ে আছি।”

বহু দশক ধরে ক্যান্সার, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং আরো অনেক কিছুর সঙ্গে ডাইক্লোরোডিফেনাইলট্রিক্লোরোইথেন বা ডিডিটি, সিগারেট ও বায়ুদূষণের সম্পর্ক দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার তুলনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরার বিষয়টিকে জটিল মনে হচ্ছে তাদের কাছে।

পেনসিলভানিয়ার পেন স্টেট বেরেন্ড কলেজের শেরি মাসন বলেন, নিশ্চিতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের চেয়ে সিগারেটের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা সহজ।

আরেকটি সমস্যা হল, মাইক্রোপ্লাস্টিক এক রকমের নয়। মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল, কন্টেইনার থেকে এসবের উৎপত্তি। এর সঙ্গে রাসায়নিক সংযোগও রয়েছে।

২০২১ সালের একটি সমীক্ষায় সুইজারল্যান্ডের গবেষকরা দেখিয়েছেন, প্লাস্টিক তৈরিতে ১০ হাজারের বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪০০টি মানুষের শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এছাড়া প্লাস্টিক অন্য রাসায়নিকও বহন করতে পারে, যা প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় না। ওই সব রায়াসনিক প্লাস্টিকের মাধ্যমে মিশে প্রবেশ করে মানব শরীরে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকে থাকা এসব উপাদানকে ‘অজানা রাসায়নিকের ককটেল’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন মিজৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রেডরিক ভম সাল।

ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও মানব স্বাস্থ্যের মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করাটাই বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের খুঁজে দেখতে হবে প্লাস্টিক মিশে থাকা সম্ভাব্য রাসায়নিক, প্লাস্টিক কণার আকার-আকৃতি এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোতে এসবের প্রভাব কতটা।

রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্ট্যাপলটন বলেন, “…মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত প্রভাব রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে এই কণাগুলো খুঁজে পাচ্ছি।”

এসব প্লাস্টিক কণা অনুসন্ধানে তাদের কৌশল বা উপায়কে আরো পরিশুদ্ধ করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে শরীরে ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি অনুসন্ধানে বিভিন্ন উপায় খুঁজছেন তারা। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার ওপর আলো ফেলতে হবে বিজ্ঞানীদের। দেখতে হবে কোন উপাদানগুলো আসলে তারা খুঁজছেন।

কিন্তু ওই কণাগুলো খুঁজে বের করলে তা হবে প্লাস্টিক কণার বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্ধেক কাজ। এরপর দেখতে হবে, সেগুলো সংখ্যায় কত, শরীরে কতক্ষণ থাকে, আর কোন রাসায়নিকগুলো তারা ধারণ করছে। এরপরই সেসব ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে মানুষের নানা রোগবালাইয়ের সম্পর্ক তারা দেখাতে পারবেন।

“কিন্তু হতাশার জায়গাটা এখানেই,” বলেন শেরি মাসন।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ‍জটিল জিনিস। বায়ু দূষণের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু এখন গবেষকরা দেখছেন, বায়ু দূষণের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকও রয়েছে।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় মানুষ শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে ২৭২ টুকরো মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে।

ভিয়েনার মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্যাথলজির অধ্যাপক লুকাস কেনার বলেন, “আমাদের রেডার স্ক্রিনেও এমনটি দেখা যায়নি।”

মাইক্রোপ্লাস্টিক যে মানুষের শরীরে ক্ষতি করছে, সে ব্যাপারে কিছু প্রমাণও দেখাতে হবে বিজ্ঞানীদের। ল্যাবে মানুষের কোষে মাইক্রোপ্লাস্টিক যোগ করে দেখা গেছে, কোষগুলো মারা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় নেপালের গবেষকরা দেখিয়েছেন, টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা হৃদরোগীদের তিন বছরের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। অন্য একটি গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আনা ইঁদুরের ‘স্মৃতি বিলোপের মত’ আচরণ দেখা গেছে। প্লাস্টিকে থাকা অনেক রাসায়নিক আবার ক্যান্সার সৃষ্টি বা হরমোন বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে প্লাস্টিক কণাগুলো কীভাবে স্থানারিত হয় এবং শরীরে গিয়ে জমা হয়, সেই বোঝাপড়া আর ল্যাবে ইদুর বা মানুষের সেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করে গবেষণা করা এক নয়।

পেন স্টেট বেরেন্ড কলেজের গবেষক শেরি মাসন বলেন, “সম্ভবত পরবর্তী দশকে এসব ব্যাপারে আমরা অনেক ভালো তথ্য-উপাত্ত পাব। কিন্তু আামাদের কাছে কখনোই সব প্রশ্নের উত্তর থাকবে না।”

আমেরিকান কেমিস্ট্রি কাউন্সিলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কিম্বার্লি ওয়াইজ হোয়াইট বলছেন, “বাস্তব জগতের মানুষের জন্য ল্যাবের ওই গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

“মানব শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার বিষয়টি জটিল। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, আচরণ ও পরিবেশগত চাপের প্রভাবে তা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।”

১৯৫০ সালে বিশ্ব ২০ লাখ টন প্লাস্টিক উৎপাদন করেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে উৎপাদন হয়েছে ৪৬ কোটি টন। আর ব্যবহৃত বা নষ্ট প্লাস্টিক পণ্য যখন ভেঙে ফেলা হয়, তখন তা আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরায় পরিণত হয়। ফলে অতিক্ষুদ্র কণাগুলো মানুষের শরীরে শ্বাস বা বিভিন্নভাবে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।

স্ট্যাপলটন বলেন, “৪০ বছর আগে আমাদের পরিবেশে এখনকার মত এত প্লাস্টিক ছিল না। আর এখন থেকে ২০ বছর পরে কেমন হবে?”

ভম সাল বলেন, খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের মত সংস্থাগুলোর উচিত খাবার প্যাকেজিংয়ের মত জিনিসগুলোতে বিভিন্ন রাসায়নিকের পরিমাণ সীমিত করা। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, গ্রিজ, তেল এবং পানির পাত্র বানানোর রাসায়নিক খাবার প্যাকেজিংয়ে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সেজন্য ১৮ মাসের বেশি পাবে কোম্পানিগুলো।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিক নিয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকির পুরোপুরি চিত্র না জানা গেলেও সরকারগুলোর উচিত প্লাস্টিক ব্যবহারে লাগাম টানা।

ভিয়েনার মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্যাথলজির অধ্যাপক লুকাস কেনার বলেন, “আমি একজন ডাক্তার, আর আমাদের নীতি হল ‘কারো ক্ষতি না করা’। কিন্তু আপনি যদি সব জায়গায় প্লাস্টিক ফেলেন এবং আপনার যদি ধারণা না থাকে আপনি কী করছেন, তাহলে আপনি ওই নীতির সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছেন।”

পেন স্টেট বেরেন্ড কলেজের শেরি মাসন বলছেন, “পরিবেশে আমরা এখন প্লাস্টিকের প্রবাহ কমিয়ে আনতে পারি। আমার মনে হয় মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যাপারে পূর্ব সতর্কতা নিতে আমাদের যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে।”

কিন্তু তার উদ্বেগ, সিগারেট কোম্পানির মত প্লাস্টিক শিল্প মালিকরা পিছুটান দিতে পারে। নিয়ম মানার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাতে পারে। প্লাস্টিক দূষণের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।

“সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারব কিনা, নিশ্চিত না” বলেন তিনি।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top